আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল ব্যুরো
সাবেক চিফ হুইপ আওয়ামী লীগ নেতা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা মামলার চার্জশিট দাখিল করা হচ্ছে। এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনা এবং মেমোরেন্ডাম অব এভিডেন্স জমা দেয়া হয়েছে কমিশনে। ওই প্রস্তাবনায় তার বিরুদ্ধে প্রায় পৌনে ২ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য গোপন ও ৫৭ লাখ টাকা কর ফাঁকির অভিযোগ আনা হয়েছে। এদিকে আজ বৃহস্পতিবার হাসানাতের বিরুদ্ধে এনবিআর কর ফাঁকির আরেকটি মামলা দায়ের করবে ঢাকা সিএমএম আদালতে।
জরুরি অবস্থা জারির সময় থেকেই ভারতে অবস্থানরত হাসানাত আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন আইনে মামলা হয় ৬ সেপ্টেম্বর। দুদকের সহকারী পরিচালক রাহেলা খাতুন বাদী হয়ে ধানমণ্ডি থানায় দায়ের করা ওই মামলায় সম্পদের তথ্য গোপন, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কর ফাঁকির অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। পরে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান কমিশনের সহকারী পরিচালক শফিউল আলম। প্রায় দেড় মাসব্যাপী তদন্ত শেষে বুধবার মামলা সংক্রান্ত এমই এবং প্রস্তাবিত চার্জশিট জমা দেয়া হয়।
দুদকের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ৫২ লাখ ৫৫ হাজার ৭০২ টাকা মূল্যের সম্পদের তথ্য গোপন করার প্রাথমিক অভিযোগে মামলাটি দায়ের হলেও তদন্তে বেরিয়ে পড়েছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। দুদকে জমা দেয়া হিসাব বিবরণীর বাইরে হাসানাত আবদুল্লাহর নামে থাকা মোট ১ কোটি ৬৩ লাখ টাকার সম্পদের সন্ধান পেয়েছে কমিশন। বিষয়টি অনুসন্ধানের দায়িত্বে থাকা ১৭ নং টাস্কফোর্সের সংগৃহীত এ সংক্রান্ত প্রমাণপত্র ইতিমধ্যে জমা দেয়া হয়েছে দুদকে। টাস্কফোর্স সূত্র জানায়, কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী মোট ৫৮ লাখ ৯৯ হাজার ৯৭৭ টাকার সম্পদ থাকার হিসাব দিয়েছে হাসানাত পরিবার। এর বাইরে তার নামে বরিশালে সোনালী ব্যাংকের লকারে পাওয়া গেছে ২৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা মূল্যমানের ৩৯ হাজার ইউএস ডলার, ৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা মূল্যের ৪০ ভরি স্বর্ণ, ঢাকার কলাবাগানে বাড়ি বর্ধিতকরণে ব্যয় হওয়া ৫২ লাখ ৫৫ হাজার ৭০২ টাকা এবং বেশ কিছু জমি ও বাড়ি।
হাসানাত পরিবারের নামে থাকা মোট সম্পদের তেমন কোন বৈধ উৎস খুঁজে পায়নি টাস্কফোর্স। নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ঢাকার ২৫/১ লেক সার্কাস, কলাবাগানে ৪.৫১ কাঠা জমির ওপর থাকা ৪ তলা বিল্ডিংসহ বাড়িটি ১৯৯৫ সালে ২৫ লাখ টাকা মূল্যে কেনা হয়েছে বলে দেখানো হলেও ওই টাকার বৈধ কোন উৎস খুঁজে পাওয়া যায়নি। চিফ হুইপ থাকা অবস্থায় ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে হাসানাত আবদুল্লাহর আয়কর নথিতে সম্মানী ভাতা এবং কৃষি খাত বাবদ মোট আয় দেখানো হয় ৮৫ হাজার ৮৪০ টাকা। আয়কর নথিতে দেয়া তথ্য অনুযায়ী ১৯৯৬ সাল পর্যন্- ২ লাখ ২৯ হাজার ৬৯০ টাকার মালিক ছিলেন তিনি। সে ক্ষেত্রে ২৫ লাখ টাকায় তিনি কি করে বাড়ি কিনলেন? সূত্রগুলো জানায়, সংসারে কোন খরচ না করে বার্ষিক আয়ের পুরো টাকা জমা রাখলেও বাড়ি কেনায় ২২ লাখ ৭০ হাজার টাকার ঘাটতি ধরা পড়ে। বরিশালে ন্যাশনাল ব্যাংকের একটি শাখায় ২২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা রয়েছে হাসানাত পরিবারের। দুদকে জমা দেয়া হিসাব বিবরণীতে ব্যবসায়িক সূত্রে ওই টাকা আয় হয়েছে বলে দাবি করা হলেও আলোচ্য সময়ে কোন রকম ব্যবসা ছিল না এ পরিবারের। সোনালী ব্যাংক বরিশাল কর্পোরেট শাখায় পাওয়া ৩৩ হাজার ৪শ’ ডলার এবং ৫ হাজার ডলার সমমানের ট্রাভেলার্স চেকেরও বৈধ কোন উৎস পাওয়া যায়নি। তাছাড়া সরকারি আইন অনুযায়ী কোন ব্যক্তি নিজের কাছে ৪ হাজার ৯৯৯ ডলারের বেশী বিদেশী মুদ্রা রাখতে পারে না।
এদিকে ৫৭ লাখ টাকা কর ফাঁকির অভিযোগে নতুন আরেকটি মামলা হচ্ছে হাসানাত আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে। আজ ঢাকার মেট্রোপলিটন সেশন জজ আদালতে মামলাটি দায়ের করবেন এনবিআরের একজন ডেপুটি কমিশনার। বিগত প্রায় ১৫ বছর ধরে ট্যাক্সের ফাইলে মিথ্যা তথ্য প্রদান, সম্পদের বর্ণনা গোপন এবং এর মাধ্যমে কর ফাঁকি দেয়ার অভিযোগে দায়ের হবে মামলাটি। এনবিআরের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, ১৭ নং টাস্কফোর্স পরিচালিত অনুসন্ধানের পরিপ্রেক্ষিতে পাওয়া তথ্যপ্রমাণাদির ভিত্তিতে দায়ের হচ্ছে এ মামলা। ১৭ অক্টোবর এনবিআর চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সভায় মামলাটি দায়েরের অনুমোদন দেয়া হয়।
তথ্যসূত্র: দৈনিকযুগান্তর