১০ অক্টোবর, ২০০৭
মিজান মালিক
কুমিল্লার দেবিদ্বারের বিএনপিদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী ও তার স্ত্রী-পুত্রসহ চারজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা দুর্নীতি মামলার রায় প্রদান করেছেন ৫ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক। মঙ্গলবার ঘোষিত রায়ে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীকে ১৩ বছর কারাদণ্ড, ৬৫ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ১ বছরের কারাদণ্ড এবং প্রায় ৬৪ লাখ টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেয়া হলেও মুন্সীর স্ত্রী ও দুই ছেলেকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়। অন্য কোন মামলা না থাকলে তাদের মুক্তির নির্দেশ দেয়া হয়। দুদক প্রসিকিউশন থেকে এ রায়ের প্রতিক্রিয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়নি।
৩ ফেব্রুয়ারি যৌথ বাহিনীর বড় ধরনের অভিযানে গ্রেফতার হন মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত দুদকের ৫০ সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজের তালিকায় মুন্সীর নামও ছিল। দুদকের নোটিশ পেয়ে ৭২ ঘন্টার মধ্যে ৩ কোটি ৩২ লাখ ১০ হাজার ৮১০ টাকার সম্পদের হিসাব দেন মুন্সী। সেই সূত্রে দুদক অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধান শেষে ২৭ মার্চ মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী, তার স্ত্রী মাজেদা আহসান, ছেলে রিজওয়ানুল আহসান ও রিজভিউল আহসানের বিরুদ্ধে ৬ কোটি ৫৫ লাখ ৩৩ হাজার ৪৭৯ টাকার সম্পদ অসাধু উপায়ে অর্জনে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়। মামলাটি দায়েরের পর মুন্সীর পক্ষ থেকে হাইকোর্টে আবেদন করে জানানো হয়, তাদের বেশকিছু সম্পদের তথ্য সম্পদ বিবরণীতে ভুলে সন্নিবেশ করা হয়নি। দুদকও সম্পূরক হিসাব নিতে চাচ্ছে না। আদালত এ অবস্থায় মুন্সীর সম্পূরক হিসাব বিবরণী নিতে নির্দেশ দিলে মুন্সীর পক্ষে ১৪ মে গোপনকৃত ৩ কোটি ১৩ লাখ ৯৩ হাজার ১৯৯ টাকার সম্পদের সম্পূরক তথ্য দুদকে দাখিল করা হয়। আদালতের নির্দেশ থাকায় চার্জশিটে সম্পূরক হিসাব বিবরণীর সম্পদের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করায় মুন্সী পরিবারের অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদের অর্থমূল্য কমে গিয়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ১১ লাখ টাকায়। এই সম্পদের মধ্যে রয়েছে মুন্সীর গুলশানের বাড়ি, এনসিসি ব্যাংকে ৩ লাখ ৬১ হাজার ৯০০ টাকার রাইট শেয়ার, মার্সিডিজ পাজেরো বেঞ্জ ও একটি নিশান পিকআপ গাড়ি।
আদালতের রায়ে এসব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
মুন্সীর স্ত্রীর নামে কুমিল্লার দেবিদ্বারের বাড়ি, গুলশানের ২টি ফ্ল্যাটসহ প্রায় ৪ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। দুই ছেলের নামে রয়েছে প্রায় ৭৫ লাখ টাকার সম্পদ। সম্পদের হিসাব বিবরণীতে প্রথমে এসব সম্পদ গোপন করা হলেও হাইকোর্টের নির্দেশে তা দুদককে জানানোর ফলে মুন্সী পরিবারের অঘোষিত সম্পদের পরিমাণ কমে যায়। বিশেষ আদালতের রায়ে খালাস পান মুন্সীর স্ত্রী-সন্তানরা।
কর্মকর্তারা জানান, একজনের অপরাধে অন্যজন সাজা ভোগ করবে না। এর আগে একই আদালত থেকে টিএন্ডটি সিবিএ নেতা ফিরোজ মিয়ার স্ত্রী রওশন আরাকেও বেকসুর খালাস দেয়া হয়।
দুদকের তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বিচার বিষয়ে ২০০৪ সালের দুদক আইনের ২৭(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোন ব্যক্তি তাহার নিজ নামে বা তাহার পক্ষে অন্য কোন ব্যক্তির নামে এমন স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি দখলে রাখিয়াছেন বা মালিকানা অর্জন করিয়াছেন, যাহা অসাধু উপায়ে অর্জিত হইয়াছে এবং তাহা জ্ঞাত আয়ের উৎসের সহিত অসঙ্গতিপূর্ণ বলিয়া মনে করিবার যথেষ্ট কারণ রহিয়াছে এবং তিনি উক্ত রূপ সম্পত্তি দখল সম্পর্কে আদালতের নিকট বিচারে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা প্রদান করিতে ব্যর্থ হইলে উক্ত ব্যক্তির অনূধর্ব ১০ বছর এবং অন্যূন তিন বছর পর্যন্ত – যে কোন মেয়াদে কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং তদুপরি অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন এবং উক্ত রূপ সম্পত্তিসমূহ বাজেয়াপ্তযোগ্য হইবে।’
এদিকে জরুরি বিধিমালার আওতাভুক্ত দুর্নীতি মামলায় প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তির স্ত্রী ও অনূধর্ব ১৮ বছরের বয়সের সন্তানসহ অনুরূপ পোষ্যদের জামিনের বিধান রেখে সরকার ১০ সেপ্টেম্বর যে গেজেট প্রকাশ করে তার আওতায় ইতিমধ্যে হাইকোর্ট দু’জনকে জামিন দিয়েছেন। এরা হলেন সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর স্ত্রী রোমানা মাহমুদ ও মেয়ে সারা হাসিন। হাইকোর্টের বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমান ও বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বেঞ্চ থেকে রোমানা মাহমুদের জামিন মঞ্জুর হলে তিনি ৮ অক্টোবর জামিনে মুক্তি পান। এর আগে মুক্ত হন সারা হাসিন মাহমুদ। টুকুর ছেলে আবিদ হাসান মাহমুদের জন্যও জামিনের আবেদন করা হয়েছে। গত জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে জেলে পাঠায়। ইকবাল হাসান মাহমুদ ও তার স্ত্রী-পুত্রসহ চারজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। তবে এ মামলার রায়ে টুকুর স্ত্রী, পুত্র বা কন্যা খালাস পাবেন কিনা সেটা নির্ভর করছে রায়ের ওপর।
হাইকোর্ট থেকে দুর্নীতি মামলার চার্জশিটভুক্ত দু’জন নারী আসামি তথা পোষ্যের জামিন লাভ ও বিশেষ জজকোর্ট থেকে দু’জন নারী আসামি ও দু’জন ছেলে আসামির খালাস পাওয়ার ঘটনায় হতবাক হয়নি দুদক। দুদকের শীর্ষ কর্মকর্তারা রায়ে অখুশি না হয়ে বরং বলেছেন, সাজা দেয়ার বিষয়টি আদালতের ওপরই ছেড়ে দেয়া উচিত। আদালত ন্যায়বিচার করলে দুদকের তালিকাভুক্ত কোন আসামি খালাস পেলেও আপত্তি করার কিছু নেই। মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী, তার স্ত্রী ও দুই পুত্রের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়েরকারী বাদী দুদকের উপ-পরিচালক আবু সাঈদ বিশেষ আদালতের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় যুগান্-রকে বলেন, তার ধারণা, যেহেতু সম্পদ অর্জন করেছেন মুন্সী নিজেই এবং সে সম্পদ তিনি স্ত্রী ও পুত্রদের নামে রেখেছেন- তাই আদালত দুদক আইন অনুসরণ করে ওই ব্যক্তিকে (মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী) শাস্তি দিয়েছেন। আর তার স্ত্রী-সন্তানদের খালাস দিয়েছেন।
মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক আক্তার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর অবৈধ সম্পদ অর্জনে সহযোগিতার অভিযোগে তার স্ত্রী-পুত্রের বিরুদ্ধে তিনি চার্জশিট দিয়েছিলেন। কিন্তু আদালত মনে করেছেন, স্ত্রী ও সন্তানদের নামে সম্পদ গড়ে কোন অপরাধ করে থাকলে সেটা করেছেন আসামি মুন্সী। তাই তাকে সাজা দিয়ে পোষ্যদের খালাস দিয়েছেন।