চট্টগ্রাম ব্যুরো
সম্পদ বিবরণীতে ৫০ লাখ টাকার তথ্য গোপন ও শুল্কমুক্ত গাড়ি ক্রয় সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য প্রদানের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় অবশেষে আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন জামায়াত দলীয় সাবেক সাংসদ শাহজাহান চৌধুরী। সোমবার দুপুরে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক মির্জা মোহাম্মদ আইয়ুব আলীর আদালতে আত্মসমর্পণ করলে আদালত তাকে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন। এদিন চার্জ গঠনের নির্ধারিত তারিখ থাকলেও আসামি পক্ষের আইনজীবীদের সময়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তা পেছানো হয়। আদালত আগামী ৪ নভেম্বর এ মামলার চার্জ গঠনের পরবর্তী তারিখ ধার্য করেছেন। এ মামলায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খানের ছেলে প্যাসিফিক মোটরসের এমডি ফয়সাল মোরশেদ খানও আসামি। দুদক শাহজাহান চৌধুরীর অবৈধ অর্থ বৈধ করতে সহযোগিতা করার অভিযোগে ফয়সালকেও এ মামলায় আসামি করে।
জানা গেছে, জামায়াত নেতা শাহজাহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুদকের এ মামলাসহ অন্তত ৩০টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে সাতকানিয়ার মুক্তিযোদ্ধা নুরুল কবির হত্যা মামলায় তার বিরুদ্ধে চার্জ গঠিত হয়েছে। ভয়ংকর সব অভিযোগের হুলিয়া নিয়ে জরুরি অবস্থা জারির কিছুদিন পর থেকে আত্মগোপনে ছিলেন শাহজাহান চৌধুরী।
দুদকের দায়ের করা মামলার নির্ধারিত চার্জ গঠনের তারিখে সোমবার আদালতে আত্মসমর্পণের আবেদন জানান শাহজাহান চৌধুরীর আইনজীবী। আদালতের বাইরে থেকে গ্রেফতার এড়াতে সকালে কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে তিনি দেওয়ানবাজারে তার এক আইনজীবীর চেম্বারে অবস্থান নেন। দুপুর ১২টায় ক্যাডার ও আইনজীবী পরিবেষ্টিত হয়ে তিনি আদালতে হাজির হন।
শাহজাহান চৌধুরীর পক্ষে আইনজীবীরা আদালতে চারটি পিটিশন দেন। এগুলো হল- চার্জ গঠনের তারিখ এক সপ্তাহ পেছানো, মামলার সার্টিফাইড কপি সরবরাহ, কারা হাসপাতালে প্রেরণপূর্বক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং ভিআইপি বন্দির মর্যাদা দেয়া। তার পক্ষে অ্যাডভোকেট সাধনময় ভট্টাচার্য, মঞ্জুর আহমদ আনসারিসহ ১৫/২০ জন আইনজীবী শুনানিতে অংশ নেন। অন্যদিকে মহানগর পিপি আহসানুল হক হেনা এসব আবেদনের তীব্র বিরোধিতা করেন। আদালত উভয়পক্ষের শুনানি শেষে সময়ের আবেদন মঞ্জুর করে আগামী ৪ নভেম্বর চার্জ গঠনের তারিখ ধার্য করেন। কারা কর্তৃপক্ষকে জেল কোডের বিধান অনুযায়ী শাহজাহান চৌধুরীর ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। জেল হাজতে নেয়ার জন্য আদালতের কাঠগড়া থেকে বের করার পর শাহজাহান চৌধুরীর আ্তীয়-স্বজনরা তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
দুদক সূত্র জানায়, গত ২০ ফেব্রুয়ারি দুদকে দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে শাহজাহান চৌধুরী তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ দেখান ৩ লাখ ৪১ হাজার টাকা। এছাড়া সংসদ সদস্য থাকাকালীন বিগত জোট সরকারের শেষ দিকে তিনি শুল্কমুক্ত সুবিধায় ৪৯ লাখ টাকা দামের একটি ল্যান্ড রোভার রেঞ্জ রোভার ভি-৮ গাড়ি আমদানি করার কথা উল্লেখ করেন। এ গাড়ির মূল্য বাবদ আমেরিকায় অবস্থানরত তার ছোট ভাই শাহ আলম চৌধুরীর কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা ধার নিয়ে পরিশোধ করলেও বাকি টাকা পরিশোধ করতে না পারায় ঢাকার আমদানিকারক এজেন্ট মোটর ওয়ার্ল্ড লিমিটেড থেকে ওই গাড়ি ছাড় করতে পারেননি বলে সম্পদ বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু দুদকের তদন্তে শাহজাহান চৌধুরী তার ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে টাকা ধার নেয়ার কোন প্রমাণপত্র দেখাতে পারেননি। এছাড়া মোটর ওয়ার্ল্ড নামে যে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গাড়িটি আমদানি করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে তাও মিথ্যা। দুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়, শাহজাহান চৌধুরী আরব-বাংলাদেশ ব্যাংক মহাখালী শাখায় তার নামে একটি একাউন্ট খোলেন ২০০৬ সালের ৬ আগস্ট। এবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ফয়সাল মোরশেদ খান ওই একাউন্টে ৫০ লাখ টাকা প্রদান করেন চেক মারফত। শাহজাহান চৌধুরী ওই টাকা থেকে গাড়ির এলসি বাবদ ইংল্যান্ডের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করেন ৪৯ লাখ ৪৯ হাজার ৩৬৪ টাকা। গাড়ির এলসি খোলার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন ব্যাংকের চেয়ারম্যান ফয়সাল মোরশেদ। একই সঙ্গে তিনি শাহজাহান চৌধুরীর অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ এ প্রক্রিয়ায় বৈধ করার অপচেষ্টায়ও সহযোগিতা করেন বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়। শাহজাহান চৌধুরী তার সম্পদ বিবরণীতে এই গাড়ি আমদানির কথা উল্লেখ করলেও বাকি ২৯ লাখ ৪৯ হাজার টাকা পরিশোধ করতে না পারায় গাড়িটি ডেলিভারি নেননি বলে উল্লেখ করেন। গাড়িটি মোটর ওয়ার্ল্ডের জিম্মায় রয়েছে বলেও তিনি জানান। কিন্তু দুদক কর্মকর্তারা অভিযান চালিয়ে প্যাসিফিক মোটরসের শোরুমের বেসমেন্ট ফ্লোর থেকে গাড়িটি আটক করে। পরে দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি শাহজাহান চৌধুরী ৭০ হাজার ৩০০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি দিয়ে মিরপুর বিআরটিএ অফিস থেকে তার নামে গাড়িটির রেজিস্ট্রেশন গ্রহণ করেন।
দুদকের তদন্তে শাহাজাহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে শুল্কমুক্ত কোটার সুবিধা গ্রহণ করে জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত ৪৯ লাখ ৪৯ হাজার ৩৬৪.৩৭ টাকায় একটি ব্রান্ড নিউ ল্যান্ড রোভার রেঞ্জ রোভার ভি-৮ গাড়ি আমদানি এবং ফয়সাল মোরশেদ খানের বিরুদ্ধে জামায়াত নেতার এ অবৈধ অর্থ বৈধ করতে সহযোগিতা করার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ এর ২৬ ও ২৭ ধারা, তৎসহ জরুরি বিধিমালা-২০০৭ এর ১৫ঘ (৫) ধারা এবং দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ৩০ সেপ্টেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম এ চার্জশিট দাখিল করেন। এর আগে দুদক কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বাদী হয়ে শাহজাহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
তথ্যসূত্র: দৈনিকযুগান্তর